
আমিনুল হক ভূইয়া: দেশের ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থান চাহিদা, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের ন্যায্য বাজার নিশ্চিতকরণ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ৬ হাজার ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে স্থানীয় সম্পদ, দক্ষতা ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বেকারের হাতকে কর্মীর হাতে এবং কর্মীর হাতকে উদ্যোক্তার হাতে রূপান্তরের একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার, নারী সমাজের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এই যুগান্তকারী উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরতে রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে মিট দ্য প্রেস ও অংশীজন সংলাপ আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আর্কিটেকচার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এআরডি)-এর প্রধান নির্বাহী পরিচালক স্থপতি সুমসান নাহার মুন্নি সাংবাদিকদের সামনে প্রস্তাবিত ৬ হাজার ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের মেগা মাস্টার প্ল্যান-এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, বিনিয়োগকারী, গবেষক, পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।
স্থপতি সুমসান নাহার মুন্নি বলেন, এটি কোনো একক ব্যবসায়িক প্রকল্প নয়, বরং স্থানীয় উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, জ্ঞান বিনিময়, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রের আওতায় আনার প্রস্তাবিত জাতীয় কাঠামো।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ, কৃষি, কারিগরি দক্ষতা, ঐতিহ্য, উদ্যোক্তা এবং বাজারের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এসব সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হচ্ছে না। ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো সেই বিচ্ছিন্ন সম্ভাবনাগুলোকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কাজ করবে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষকবান্ধব স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা দূরের বাজারে পাঠানোর পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়েই সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা হলে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের অধিক মূল্য পেতে পারেন। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরি হলে গ্রামে থেকেই মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
পরিকল্পনায় স্থানীয় উৎপাদন, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামাজিক বিনিময়, জ্ঞান বিনিময়, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং বাজার সংযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষি, মৃৎশিল্প, তাঁত, পাদুকা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, কুটির শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এই উদ্যোগের আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো নারী সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তি। দেশের বিপুলসংখ্যক নারী ঘরে বসে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, পোশাক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অনলাইন ব্যবসা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পুঁজি, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজার ও ব্র্যান্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের অনেক উদ্যোগ বড় পরিসরে যেতে পারে না। ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় প্রশিক্ষণ, উৎপাদন সুবিধা, অর্থায়ন ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে নারীরা আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ৬ হাজার ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চল একসঙ্গে নির্মাণের পরিকল্পনা নয়। এটি একটি প্রস্তাবিত জাতীয় নেটওয়ার্ক স্কেল। পাইলট মূল্যায়ন কোহর্ট স্কেল-আপ পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে গাজীপুর মডেল ও নির্বাচিত পাইলট জোনের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা হবে। এরপর মাঠপর্যায়ের ফলাফল, সম্ভাব্যতা ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে আঞ্চলিক সম্প্রসারণ করা হবে।
তবে আয়োজকরা স্পষ্ট করেছেন, ৬ হাজার জোনের পুরো অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি এবং এটিকে সরকার-অনুমোদিত জাতীয় প্রকল্প হিসেবেও দাবি করা হচ্ছে না। সম্ভাব্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক অর্থায়ন, এসএমই ও সবুজ অর্থায়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), সিএসআর জলবায়ু অর্থায়ন এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
৬ লাখ কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গেও আয়োজকদের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এটি নিশ্চিত চাকরির সংখ্যা নয়। বরং ৬ হাজার জোনে গড়ে ১০০ জন উদ্যোক্তা যুক্ত হলে প্রায় ৬ লাখ উদ্যোক্তার একটি সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক সক্ষমতা তৈরি হতে পারে, এটি একটি পরিকল্পনাগত ধারণা। প্রকৃত কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, ব্যবসার সাফল্য, বিনিয়োগ, বাজার এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফলাফলের ওপর।
পরিকল্পনাটির মূল দর্শন হলো, মানুষের প্রয়োজনের একটি অংশ যতটা সম্ভব স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও সমাধান করা। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলে দেশের অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নকে শুধু বড় শিল্পনগরী বা কেন্দ্রীয় অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রত্যন্ত গ্রাম, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী, যুবসমাজ এবং স্থানীয় কারিগরদের অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসতে হবে। একটি শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও মজবুত করতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুর রহমান পাপন, গ্রিন বিল্ডিং অ্যাকাডেমির সভাপতি প্রকৌ. মো. আল এমরান হোসেন এবং বাংলাদেশ অর্গানিক পণ্য প্রস্তুতকারক সমিতি (বিওপিএমএ)-এর নাসিরুল ইসলাম-সহ বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, স্বচ্ছ পরিকল্পনা, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে প্রস্তাবিত ৬ হাজার ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এটি শুধু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নয়, বরং বেকারের হাতকে কর্মীর হাতে, কর্মীর হাতকে উদ্যোক্তার হাতে এবং স্থানীয় সম্পদকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তরের একটি সম্ভাবনাময় কাঠামো।
নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, কৃষকের উৎপাদনের মূল্য সংযোজন, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং গ্রামভিত্তিক শিল্পের বিকাশ সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই মহাপরিকল্পনার ধারণা সামনে এসেছে। আয়োজকদের ভাষায়, এর মূল দর্শন জাতীয়ভাবে চিন্তা করুন, স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা করুন, পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করুন এবং ক্রমাগত শিখুন।














