স্টাফ রিপোর্টার: গত সোমবার রাতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায়ও দুই সংগঠনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একই সপ্তাহে চারটি পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের এই ধারাবাহিকতা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা, সহাবস্থান ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সোমবার সন্ধ্যায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রশিবির আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর একটি ব্যানার নিয়ে আপত্তি তোলে ছাত্রদল। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত দশজন আহত হন এবং রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে যান চলাচল কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। রাত পৌনে ১১টা পর্যন্ত ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে এবং ছাত্রদল পার্কের মোড়সংলগ্ন এলাকায় মুখোমুখি অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মঙ্গলবার বহিরাগতদের প্রবেশে বিধিনিষেধ জারি করে এবং ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারির জন্য পুলিশ কমিশনারের কাছে অনুরোধ জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকাত আলী জানান, প্রশাসন কোনো ধরনের সহিংসতাকে সমর্থন করে না এবং শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরে ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার আহ্বান জানান।

মঙ্গলবার সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ক্যাম্পাসের নানা দাবিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) প্রতিনিধিদের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বাধা দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর ছাত্রদল, জকসু, ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে জকসুর সহ-সভাপতি মো. রিয়াজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও একজন সাংবাদিক আহত হন বলে জানা গেছে।

জকসুর নেতারা অভিযোগ করেন, লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারেও ভাঙচুর করা হয়। অন্যদিকে ছাত্রদল অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, সাধারণ শিক্ষার্থীরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। সংঘর্ষের পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান এবং আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে সংশ্লিষ্ট এলাকায়ও হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার কিছু সময় পর গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব এলাকায় ঢাকা কলেজে একটি কর্মসূচিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ফের সংঘর্ষে জড়ায়। লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে দুই পক্ষ পরস্পরকে ধাওয়া দেয়, যার ফলে সায়েন্সল্যাব ও আশপাশের এলাকায় যান চলাচল কিছু সময়ের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে শিবিরের অন্তত বিশজন ও ছাত্রদলের সাতজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

একই দিন বিকেলে চকবাজারের ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এলাকায়, জাতীয় মেডিকেল কলেজের সামনে, হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। শিবিরের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, হলের সিট অবৈধভাবে দখলের প্রতিবাদ করায় তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতিতেও এলাকায় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত মাদ্রাসা এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে।

একই সপ্তাহে দেশের চারটি ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরপর সংঘর্ষের এই ঘটনাপ্রবাহ ছাত্ররাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আয়োজিত কর্মসূচি, স্মারক অনুষ্ঠান বা প্রতীকী প্রদর্শনী প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে তুলনামূলক ছোট ইস্যু থেকে, যা দ্রুত সহিংস রূপ নিয়েছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একাধিক প্রতিষ্ঠানে হল ও ক্যাম্পাস এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে এবং অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাম্পাসে বারবার সহিংস ছাত্ররাজনীতির পুনরাবৃত্তির পেছনে সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবস্থান শক্ত করার প্রবণতা এবং কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ছাত্রসংগঠনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সংঘর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে এবং সমাধানের জন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংলাপ, প্রশাসনের কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা নতুন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও বিভিন্ন কলেজেও অতীতে ভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সংঘাতের নজির রয়েছে। এসব ঘটনার তুলনায় বর্তমান সপ্তাহের সংঘর্ষগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, একই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় একই ধরনের উপলক্ষ ও কারণে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়া, যা পর্যবেক্ষকদের কাছে উদ্বেগজনক বলে মনে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন প্রতিটি ঘটনার পরই সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতিমধ্যে ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে, আর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারির অনুরোধ জানিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—উভয় সংগঠনই নিজ নিজ বিবৃতিতে পরস্পরকে সংঘর্ষের সূত্রপাতের জন্য দায়ী করেছে এবং নিজেদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসির পক্ষ থেকে এখনো সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিগত প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত থাকা ইউজিসি চেয়ারম্যান ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বলে জানা গেছে।

 

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email