রাবি প্রতিনিধি: মোবাইল সাংবাদিকতার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের গল্পকথক তৈরি এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মোবাইল সাংবাদিকতা (MoJo) নিয়ে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মশালায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সংবাদ সংগ্রহ, তৈরি ও উপস্থাপনের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

‘ক্লাসরুম টু নিউজরুম: মোবাইল জার্নালিজম (MoJo) ট্রেনিং ওয়ার্কশপ অ্যান্ড স্ট্রিংগার ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে যৌথভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং ঢাকার মুদ্রণ ও অনলাইন গণমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১.৩০ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১২৩নং কক্ষে এ কর্মশালা হয়। এ সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়।

এই সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবেই আজকের এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এতে স্বাক্ষর করেন রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হোসেন বকুল ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হেড অব মাল্টিমিডিয়া মজুমদার বাবু। এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বিভাগের শিক্ষার্থীদের টিবিএসের সঙ্গে কাজ, পেশাদার নিউজরুমের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজেদের তৈরি সংবাদ ও অন্যান্য কনটেন্ট প্রকাশের সুযোগ তৈরি হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হোসেন বকুল। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধিকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম। উপস্থিত ছিলেন এই কর্মশালা আয়োজনের আহ্বায়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক মশিহুর রহমান ও বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার।

কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন অধ্যাপক মশিহুর রহমান। পরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মাল্টিমিডিয়া বিভাগের প্রধান মজুমদার বাবু বক্তব্য দেন। ‘ক্লাসরুম টু নিউজরুম’ প্রকল্পের বিষয়ে ধারণা দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এই কর্মশালার লিড ট্রেইনার রাজীব নন্দী।

মজুমদার বাবু ও অধ্যাপক রাজীব নন্দী কর্মশালায় মূল সেশন পরিচালনা করেন। এ ছাড়া কর্মশালায় টিবিএসের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইরফান ও এসআর শাওন মোবাইল সাংবাদিকতার বিভিন্ন বিষয়ে পৃথক উপস্থাপনা করেন। এই কর্মশালায় বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ থেকে এমএসএস প্রথম সেমিস্টারের ৫৭ জন শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক মশিহুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকতার নানা বিষয় জানলেও বাস্তবে কীভাবে এবং কোথায় সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে হবে, সে জায়গায় একটি ঘাটতি থেকে যায়। একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে এই গ্যাপ কমানো সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মাস্টারক্লাস, লেকচার, সেমিনার, যৌথ কার্যক্রম ও ফিল্ড রিপোর্টিংয়ের মতো বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ পাবেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের কর্মশালাটিকে শুধু একটি প্রশিক্ষণ হিসেবে না দেখে বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানান।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মাল্টিমিডিয়া প্রধান মজুমদার বাবু বলেন, ‘আমাদের একটা প্ল্যান আছে—কানেক্টিং টু দ্য নিউজরুম। এর মাধ্যমে আপনারা টিবিএসের সঙ্গে কাজ করবেন, টিবিএসের হয়ে কাজ করবেন। এর মাধ্যমে স্টুডেন্টরা জেনে যাবে টিবিএসের নিউজরুমে কারা আছেন, কীভাবে সেখানে কাজ হয়। তাদের আর ঢাকায় গিয়ে ঘোরাঘুরি করতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকেই টিবিএসের সঙ্গে কাজ করার এবং নিউজরুমের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করার সুযোগ হবে।’

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি টিবিএসের জন্য প্রতিবেদন তৈরি ও প্রকাশের সুযোগ পাবেন। তাদের কাজ নিউজরুমে দেখা হবে এবং প্রকাশিত কাজের জন্য সম্মানীও দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থাতেই পেশাদার নিউজরুমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।

কর্মশালায় রাজীব নন্দী বলেন, মোবাইল সাংবাদিকতা মানে শুধু মোবাইল ফোন দিয়ে সাংবাদিকতা করা নয়; চলনসই যেকোনো ডিভাইস ব্যবহার করে সাংবাদিকতা করাও এর অন্তর্ভুক্ত। ড্রোন, ডিএসএলআর বা বহনযোগ্য ক্যামেরা দিয়েও মোবাইল সাংবাদিকতা করা সম্ভব। তবে মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা ও নানা সুবিধার কারণে এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম।

রাজীব নন্দী বলেন, ‘গল্প বলার ধরনটা চেঞ্জ হচ্ছে, ডিভাইসটা চেঞ্জ হচ্ছে। কিন্তু গল্প বলাটা ঠিকই আছে।’ প্রযুক্তির নতুন মাধ্যম গ্রহণের পাশাপাশি সাংবাদিকতার প্রচলিত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ধরে রেখে দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পত্রিকা পড়তে শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট করতে হতো। বৃষ্টি উপেক্ষা করে পত্রিকা পড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতেন তারা। এখন মোবাইলের এক ক্লিকেই সারা বিশ্বের খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ অনেক সহজ করে দিয়েছে। টিবিএসের সঙ্গে বিভাগের এ চুক্তি শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের জন্য বাড়তি সুবিধা দেবে।

বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোজাম্মেল হোসেন বকুল বলেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবাদিকতার ধরনও বদলে গেছে। কম্পিউটারে কম্পোজ থেকে শুরু করে সফটওয়্যারনির্ভর সংবাদ সম্পাদনা, টেলিভিশন, অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার পর মোবাইল ফোন সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস হয়ে উঠেছে। তাই শুধু মোবাইলে ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারলেই হবে না, এর মাধ্যমে সাংবাদিকতার খুঁটিনাটি বিষয়ও শেখা প্রয়োজন।

টিবিএসের সঙ্গে সমঝোতার স্মারকের মাধ্যমে একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা টিবিএসের সঙ্গে বিভিন্নভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের মধ্যে দূরত্ব কমাতে ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু সালেহ শোয়েব। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সহযোগিতায় ছিলেন বিভাগের শিক্ষার্থী কে এম সিদ্দিক, তাসিন সিদ্দিকা রূপা ও প্রান্ত কুমার দাশ।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email